ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক ক্রোড়িবাড়ি টাঁকশাল
![]() |
| ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক ক্রোড়িবাড়ি টাঁকশাল |
সোনারগাঁ(নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সোনারগাঁয়ের পথে নামলেই মনে হয় যেন সময় পিছিয়ে যাচ্ছে কয়েকশ বছর। পানাম নগরের ধ্বংসপ্রায় অট্টালিকার ভাঙা দরজাগুলো পেরিয়ে যখন আমিনপুর গ্রামের দিকে এগোই, তখনই চোখে পড়ে এক জরাজীর্ণ স্থাপনা-একটি মুদ্রাগার। বাংলার প্রাচীন রাজধানীর সময়কার টাঁকশালটি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ যেন প্রতিটি ইটে লুকিয়ে আছে বিস্মৃত ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস।
সোনারগাঁয়ের ইতিহাস বহুস্তর, বহুপুরাতন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী হিসেবে এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাণিজ্য, প্রশাসন, সংস্কৃতি সবকিছুর কেন্দ্র ছিল এই নগর। ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কার। শাসকেরা বুঝেছিলেন, অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজধানী ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ নগরগুলোতে মুদ্রা তৈরির ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সে সময়েই সোনারগাঁয়ে স্থাপিত হয় দুটি টাঁকশাল-একটি আমিনপুর গ্রামে,আরেকটি জামপুর ইউনিয়নের মহজমপুরে।মহজমপুরের টাঁকশাল সময়ের আঘাতে মুছে গেছে, কিন্তু আমিনপুরের টাঁকশালটি আজও আছে, যদিও দাঁড়িয়ে আছে কেবল অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে।
১৩৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ইলিয়াস শাহি বংশ সোনারগাঁয়ে শাসন শুরু করলে টাঁকশালের কার্যক্রম নতুন গতিপথ পায়। বংশের প্রথম শাসক শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁকে রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তীতে সুলতান গিয়াস উদ্দিন আযম শাহের আমলে এখানে মুদ্রা তৈরির কাজ সর্বোচ্চ সক্রিয় হয়।
তখনকার বাংলার রাজনৈতিক শক্তি ও বাণিজ্য সমৃদ্ধির অন্যতম প্রমাণ ছিল মুদ্রা। সোনারগাঁয়ের টাঁকশালে তৈরি এসব মুদ্রা ছড়িয়ে পড়ত দেশের প্রধান বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রে। সোনার মোহর থেকে শুরু করে রৌপ্যমুদ্রা সবই তৈরি হতো বিশেষভাবে সুরক্ষিত ভূগর্ভস্থ কুঠুরিগুলোতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, চার শতকের পুরোনো টাঁকশাল ভবনটি আজ পরিত্যক্ত। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পর্যটক বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ভবনের দিকে -যা কখনো এক নগরীর অর্থনৈতিক হৃদস্পন্দন ছিল।স্থানীয় লোকেরা আমিনপুরের এ টাঁকশালটিকে ক্রোড়ি বাড়ি বলে থাকে। মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে পরগনার রাজস্ব অধিকর্তা ও রাজস্ব সংগ্রাহকের পদবি ছিল ক্রোড়ি। তিনি ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে ১শ ৮২ জন ক্রোড়ি নিয়োগ করেছিলেন আর্থিক কাজের জন্য। ধারণা করা হয় সে থেকেই এ বাড়ির নাম ক্রোড়ি বাড়ি। সুরম্য এ টাঁকশালটির স্থাপত্যকলা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মুসলিম এবং হিন্দু স্থাপত্যের অপূর্ব সংমিশ্রনে এ টাঁকশালটি তৈরী করা হয়েছিল। টাঁকশালের দেয়ালের গায়ে জন্মেছে বিশাল বটগাছ, শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে ইটের ভাঁজে ভাঁজে। চারপাশে লতাপাতা আর আগাছা ভবনের অবয়ব আড়াল করে রেখেছে। উত্তর পাশের বিশাল দিঘিটি একসময় টাঁকশালের কর্মীদের পানির চাহিদা মেটাত বলে স্থানীয়দের ধারণা। এখন দিঘিটি ঝিমিয়ে আছে নীরবতার প্রাচীর ভেঙে।
টাঁকশালের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায় অসংখ্য খিলান, খুপরি আর কুঠুরি। দেয়ালে খোদাই করা বাজপাখি, পদ্মফুল, আর ঢেউখেলানো অলংকারিক নকশা প্রমাণ দেয় স্থাপনাটির সুলতানি কারুকৌশলের ঐতিহ্য। ইতিহাসবিদদের মতে, ভূগর্ভস্থ কুঠুরিগুলোর অনেকগুলোই একসময় ছিল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ভান্ডার -আমানত রাখা হতো সরকারি মুদ্রা ও সোনার মোহর।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকা সত্ত্বেও টাঁকশালটির বর্তমান অবস্থা শোচনীয়। দেয়ালের ইট জায়গায় জায়গায় ঝরে পড়ছে, ছাদের অংশ নুয়ে পড়েছে, আর গাছের শিকড়ে ইট চূর্ণ হচ্ছে প্রতিনিয়ত।যে স্থাপনা একসময় বাংলার অর্থনৈতিক শক্তির প্রতীক ছিল, সেটি আজ দাঁড়িয়ে আছে প্রমাণ হিসেবে-অবহেলা কীভাবে একটি অমূল্য ইতিহাসকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে,টাঁকশালটি রক্ষার উদ্যোগ না হলে খুব শিগগিরই সোনারগাঁয়ের এই অধ্যায় হারিয়ে যাবে-যেমন হারিয়ে গেছে মহজমপুরের টাঁকশাল। অথচ এই ভবনটি শুধু ইট–গাঁথুনি নয়,এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার শাসনব্যবস্থা, বাণিজ্য, মুদ্রা এবং এক রাজধানীর উত্থান–পতনের গল্প।



